Home বিনোদন শেখ হাসিনা ফিরলেন, প্রাণ পেল বাংলাদেশ

শেখ হাসিনা ফিরলেন, প্রাণ পেল বাংলাদেশ

3
0

তেতাল্লিশ বছরের নিরবচ্ছিন্ন গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম-সাধনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। কখনো রাজনৈতিক আন্দোলন, কখনোবা জনমত গড়ার লড়াই; প্রধানমন্ত্রী হয়ে কিংবা বিরোধীদলীয় নেত্রী, মাথায় মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সবসময় লড়েছেন মানুষের ভাগ্য বদলানোর বাসনা নিয়ে। অবস্থাটা এমন যে, বাঙালি আর তাঁকে নিজের দেওয়া একমাত্র গর্ববোধের পরিচয় শুধু ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা’ বলতে রাজি নন; বরং নিজের পরিচয়ে, নিজের কর্মের কারণে জাতির ‘শেষ ভরসাস্থল’, ‘মুক্তিপথের দিশারী’ বলতেও ব্যাকুল। কাণ্ডারিবিহীন ঘূর্ণাবর্তে ঘুরপাক খাওয়া জাতির জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফেরা যে মানুষটির প্রথম সফলতা ছিল দেশকে স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্তি দেওয়া

আকাশজুড়ে কালো মেঘ, প্রকৃতিতে ঝড়ো হাওয়া, অঝোর বৃষ্টি আর বিদ্যুতের ঝলকানি। মনে হয়, ১৯৮১-এর সেই বিকেলটা ক’দিন আগেরই; যদিও ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেছে চার দশকের বেশি সময়। হ্যাঁ, আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্ব-ভূমে প্রত্যাবর্তনের ৪৪তম দিবস। ব্রিটিশ লেখক সাইমন সিনেক লিখেছেন, ‘Leadership is not about the next election, itÕs about the next generation.’- ‘নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।’

সাইমনের এই বক্তব্যের ভাবগত মিল পাওয়া যায় ১৭ মে, ১৯৮১-তে দেওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ক্ষমতার জন্য আসিনি, এসেছি একটি হারানো স্বপ্ন উদ্ধার এবং একটি রক্তাক্ত আদর্শের পতাকা আবার তুলে ধরার জন্য।’ 

নির্বাচন, ক্ষমতা, রাজনীতি কিংবা প্রধানমন্ত্রিত্ব- কোনো কিছুই সেদিন তার বক্তব্যে ঠাঁই পায়নি, পেয়েছিল বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশের কোটি কোটি বাঙালির ‘হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন’ উদ্ধারের ভাবনা; যেটাকে তিনি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান মনে করতেন। তিনি বলেছিলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিতেই হয়, মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’

আকাশের কান্নাভেজা দিনে বাংলায় পা রেখে সেদিন তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন রাজনীতিবিদ নয়; সাড়ে আট কোটি বাঙালির আপনজন হিসেবে। তার ভাষায়, ‘আমি নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। এসেছি আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী কর্মী হিসেবে আপনাদের পাশে থাকতে।’
আজ সেই ১৭ মে। এই মে আরও একটি প্রত্যাবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো ৭ মে, ২০০৭। বঙ্গবন্ধুকন্যা ১৭ মে যদি বাঙালির ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরে থাকেন, তবে ৭ মে ২০০৭ ফিরেছিলেন জনগণের সঙ্গে একসঙ্গে রাজপথে হেঁটে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যয় নিয়ে।

দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার খবর, নাটকীয়ভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্রিটিশ সরকার তার দেশে ফিরতে বাধা দিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক জারিকৃত নিষেধাজ্ঞার কারণে। দেশের মাটিতে শেখ হাসিনা যাতে না ফিরতে পারেন, এজন্য বাংলাদেশ সরকার ব্রিটিশ এয়ারওয়েজকে নিষেধ করে; যে কারণে বৈধ টিকিট থাকার পরও তাঁকে যাত্রী হিসেবে নেওয়া হয়নি।

কারণ হিসেবে তাঁকে এয়ারলাইন্স কর্মকর্তা বাংলাদেশ সরকারের চিঠি দেখান (২২ এপ্রিল ২০০৭)। একদিন পর আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘ওরা আমাকে কিছুতেই আটকাতে পারবে না। দেশে ফিরবই। আমি জাতির পিতার কন্যা।’ লন্ডনভিত্তিক দ্য ট্রিবিউনকে বললেন, আমি শুধু বঙ্গবন্ধুর কন্যাই নই, তাদের কাছে একজন মা ও একজন মেয়ের মতো। 
এসব কারণেই বাঙালির জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ ও ১৭ মে। উদ্যাপনও করা হচ্ছে মহীরূপে, মহাসমারোহে। স্বীকার করতেই হবে, ’৭৫-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা-ের পর যে অন্ধকার বা বন্ধ্যা যুগ শুরু হয়েছিল, কন্যা শেখ হাসিনার ফেরার মধ্য দিয়ে সেই অন্ধকারের পর্দা সরানোর কাজ শুরু হয়েছিল ১৭ মে।

এটি নিছক কেবল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস নয়; গণতন্ত্র পুনর্জাগরণের দিন ছিল ১৭ মে, ছিল বাংলাদেশের আপন কক্ষপথে ফেরার দিন, সর্বোপরি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পুনরায় বাংলাদেশ হয়ে ওঠার দিন। আপনি বঙ্গবন্ধুকন্যাকে পছন্দ করুন বা না করুন; একটি দিকশূন্য টলায়মান জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে ওই সময়ে তার প্রত্যাবর্তন যে কতটা জরুরি ছিল, তা চলমান পরিস্থিতি সামনে রাখলেই অনুভব করতে পারবেন।

আরও অনুভব করা যাবে গত ১৫ বছর ধরে চলমান বাংলাদেশের আকাশছোঁয়া উন্নয়ন দেখলেও। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বে অকুতোভয় নেতার অভাব হয়তো কখনো ছিল না; কিন্তু জাতির ক্রান্তিলগ্নে, স্বাধীনতা-উত্তর ও বঙ্গবন্ধু হত্যাপরবর্তী বাংলাদেশে আলোকবর্তিকা হয়ে ধীমান নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানুষ একজনই সাহস দেখিয়েছিলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। সুতরাং তাঁর প্রত্যাবর্তন অতীতের সংকটকালীন বাংলাদেশের জন্য জরুরি ছিল, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্যও জরুরি থাকবে। 
কী হতো যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে না ফিরতেন? এর উত্তর আমাদের সবার জানা। নিশ্চয়ই এমন হবে, ‘বাঙালির স্বপ্নভঙ্গ হতো’, ‘বাঙালি জীবনে দ্বিতীয় রেনেসাঁ আসত না’, বাংলাদেশের ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ হওয়া’ হয়ে উঠত না কিংবা বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতো।

তবে পাশাপাশি যে জিনিসটা বেশি জানা ও বলা জরুরি তা হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরায় কী পরিবর্তন হয়েছে? কী ছিল আর কী হয়েছে বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক রূপরেখা। বিশ্ব আজ বাংলাদেশকে কিভাবে চেনে? বদলে যাওয়া সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের ভাগ্যচাকাইবা এখন দেখতে কেমন? আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজব।

॥ দুই ॥ 
তেতাল্লিশ বছরের নিরবচ্ছিন্ন গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম-সাধনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। কখনো রাজনৈতিক আন্দোলন, কখনোবা জনমত গড়ার লড়াই; প্রধানমন্ত্রী হয়ে কিংবা বিরোধীদলীয় নেত্রী, মাথায় মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সবসময় লড়েছেন মানুষের ভাগ্য বদলানোর বাসনা নিয়ে। অবস্থাটা এমন যে, বাঙালি আর তাঁকে নিজের দেওয়া একমাত্র গর্ববোধের পরিচয় শুধু ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা’ বলতে রাজি নন; বরং নিজের পরিচয়ে, নিজের কর্মের কারণে জাতির ‘শেষ ভরসাস্থল’, ‘মুক্তিপথের দিশারী’ বলতেও ব্যাকুল।

কাণ্ডারিবিহীন ঘূর্ণাবর্তে ঘুরপাক খাওয়া জাতির জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফেরা যে মানুষটির প্রথম সফলতা ছিল দেশকে স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্তি দেওয়া। ১৯৮১’র ১৭ মে থেকে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তাঁর আগমন-পরবর্তী বাঙালির বড় পাওয়া হলো- তারা স্বপ্ন দেখতে পেরেছিল।

যদিও এজন্যও দেশে ফেরার ক’দিন পরেই (৩০ মে) জেনারেল জিয়ার মৃত্যু, আরেকটি সামরিক শাসনের সূত্রাপাত হিসেবে তথাকথিত ১৫ নভেম্বর, ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য মঞ্চস্থ নাটকের সম্মুখীন এবং তাতে দলের অংশগ্রহণসহ নানা কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করে কাজ করতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে।

১৯৮৩ সালের ২৪ মার্চ সামরিক শাসন জারির দু’দিন পর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সাভার স্মৃতিসৌধে একা গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছিলেন, ‘আমি সামরিক শাসন মানি না, মানব না। বাংলাদেশে সংসদীয় ধারার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবই করব।’ বোধ করিÑ শেখ হাসিনার এই অভয়মন্ত্রের দীক্ষা নিয়েই আপামর জনগণ স্বৈররাহু থেকে দেশকে মুক্ত করেছিল।
১৯৯৬-এ ক্ষমতা গ্রহণের পর মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সব সৈনিককে প্রথমবারের মতো এক পতাকাতলে নিয়ে এসে ‘ঐক্যের প্রতীক’ হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উজ্জ্বল সেই শাসনামলে (১৯৯৬-২০০০) মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা শুরু হয়েছিল ২১ বছর পর। মুক্তি ও স্বাধীনতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল মানুষের সুপ্ত সব সম্ভাবনা। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা পায় এবং নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে আসে জনগণের।

(আগামীকাল সমাপ্য)

লেখক : মহামান্য রাষ্ট্রপতি
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ