Home বাংলাদেশ মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে বিএনপিকে হারাতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ

মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে বিএনপিকে হারাতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ

8
0

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে ধারাবাহিক বিক্ষোভ সমাবেশ করছে বিএনপি। গত ৮ অক্টোবর থেকে বিভাগীয় সমাবেশ শুরু করে দলটি। ইতিমধ্যে ৯টি বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করেছে। এসব সমাবেশে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের দারুণ সাড়াও পেয়েছে তারা। টানা কর্মসূচির শেষ বিভাগীয় সমাবেশটি হবে ঢাকায় আগামী ১০ ডিসেম্বর।

৯টি বিভাগীয় সমাবেশের মধ্যে ৭টি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিবহন ধর্মঘট ছিল আলোচনার বিষয়। আর বিএনপির সমাবেশে কত লোক হলো এ নিয়ে বিএনপির নেতাদের বক্তব্য ও রাজনীতিতে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য উত্তাপ এনে দিয়েছিল। কিন্তু ঢাকার সমাবেশকে ঘিরে রাজনীতিতে অন্য উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিএনপির সমাবেশ কোথায় হবে এ নিয়ে এখন মূল আলোচনা। বিএনপি চাচ্ছে সমাবেশ হবে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সেখানে সমাবেশ করতে দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপির জন্য রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিএনপি এত দিন বলে আসছিল তারা নয়াপল্টনেই সমাবেশ করবে। অবশ্য সেই অনড় অবস্থা থেকে এখন সরে এসেছে। এখন দলটি বলছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও তুরাগ তীরের ইজতেমা মাঠ ছাড়া রাজধানীর অন্য কোনো স্থান সমাবেশের জন্য বরাদ্দ দেয়া হলে দলটি সেখানে সমাবেশ করবে। যদিও এখন পর্যন্ত অন্য কোনো বিকল্প চূড়ান্ত হয়নি।

সমাবেশ করতে দেয়া হবে কি হবে না, এ নিয়েই সাধারণত আলোচনা হতে দেখা যায়। কিন্তু সমাবেশের স্থান নিয়ে এমন বিতর্ক, রাজনৈতিক উত্তাপ সাধারণত দেখা যায় না। হঠাৎ এমন আলোচনা নিয়ে দৈনিক বাংলা কথা বলেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে। দুই দলের নেতারাই বলেছেন, স্থান বরাদ্দ নিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু এখানে সরকার ও বিএনপির মধ্যে ইগো বা অহং কাজ করছে। স্থান নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছে- এখন যে পক্ষ নিজ অবস্থান থেকে সরে আসবে সেই পক্ষই যেন হেরে যাবে।

বিএনপি চাচ্ছে স্থান নিয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে শক্তি দেখাতে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ চাচ্ছে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মনোবলে চিড় ধরাতে, যা দলটি সম্প্রতি সারা দেশে সমাবেশের মাধ্যমে অর্জন করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আনোয়ার মনে করেন, ঢাকায় সমাবেশ নিয়ে একটা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই হচ্ছে। এখানে একটা জয়-পরাজয়ের ব্যাপার চলে এসেছে। ফলে একটা সংঘাতের আশঙ্কা কিন্তু থেকে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা রাজনৈতিকভাবে সমাধান হলে সবার জন্যই ভালো। আর এতে কে লাভবান হবে আর কে লোকসানে পড়বে সেটা সময়ই বলে দেবে।

সমস্যার সূত্রপাত যেভাবে

ঢাকা ছাড়া অন্য বিভাগীয় শহরে যেখানে সমাবেশ করতে চেয়েছে সেখানেই অনুমতি পেয়েছে বিএনপি। সমাবেশে মাইক ব্যবহার ও নিরাপত্তার জন্য পুলিশের অনুমতিরও প্রয়োজন হয়। ঢাকায় সমাবেশের জন্য বিএনপি কেবল নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনের জায়গাটি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছিল। দলটি নিজ থেকে কোনো বিকল্প স্থানের কথা উল্লেখ করেনি।

বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘তারা নয়াপল্টন চেয়েছে এই কারণে যে এখানে আগেও বিএনপি সমাবেশ করেছে। তা ছাড়া ৮-৯ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন ছিল। ফলে ১০ ডিসেম্বর সেখানে সমাবেশের জন্য অনুমতি চাওয়ার সুযোগ ছিল না। এখন সরকার কেন জায়গা নিয়ে এত কিছু করছে সেটা সরকারই বলতে পারবে।’

অতীতে অবশ্য বিএনপি বেশ কয়েকবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চেয়েও পায়নি। তখন দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছিল সরকার।

সরকারের তরফ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দেন বিএনপিকে ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রীর এই কথার পর বিএনপি নয়াপল্টনেই সমাবেশ করবে বলে জানিয়ে দেয়। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা নয়াপল্টনে সমাবেশ করার ব্যাপারে অনড় অবস্থানের কথা জানান।

আর এখানেই সরকার-বিএনপি মুখোমুখী অবস্থানে চলে আসে। আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা দৈনিক বাংলার কাছে দাবি করেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের ভোগন্তি কিছুটা কমানো। এ ছাড়া বিএনপি যদি বিশৃঙ্খলা করে তাহলে যেন সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নয়াপল্টনে বিশৃঙ্খলা হলে তা বিভিন্ন সড়কে ছড়িয়ে পড়তো। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীতে সেটা কঠিন। পুলিশ-র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সমাবেশ ঘিরে বিশৃঙ্খলা হলে তা নিয়ন্ত্রণ সোহরাওয়ার্দীতে সহজ। আশপাশে বাড়িঘর বা বসতি না থাকাটা এর একটা কারণ। কিন্তু বিএনপি যখন এই স্থানকে বাদ দিয়ে বলে দিয়েছে তারা নয়াপল্টনেই করবে তখন সরকার একে ‘চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া’ বিবেচনা করেছে। এ কারণে নয়াপল্টনে না দেয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে এসেছে সরকার।

অবশ্য তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ মনে করেন, বিএনপির কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে। এ কারণে সেখানে সমাবেশ করতে চায় না। সোহরাওয়ার্দীতে বড় বড় সমাবেশ হচ্ছে। ছাত্রলীগের সম্মেলন পর্যন্ত এগিয়ে আনা হয়েছে। সরকারের চাওয়া ছিল বিএনপি ভালোভাবে সমাবেশ করুক। কিন্তু তারা নিজেরাই সমাবেশ স্থান নিয়ে একটা ইস্যু তৈরি করার চেষ্টা করছে। সমাবেশের জন্য নয়াপল্টন দেয়া হবে না।

সমাধান কী?

ক্ষমতাসীনদের লক্ষ্য কোনোভাবেই বিএনপিকে নয়াপল্টন না দেয়া। ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশের আগেই বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করা। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, এটা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। বিএনপি যা চাইবে সেটা সেভাবেই যে হবে না, তা আগেই জানিয়ে দেয়া। বিএনপিকে অন্য ভেন্যুতে সমাবেশের আগে মনে রাখতে হবে তাদের দাবি বা চাওয়া সরকার মানেনি। এতে দলীয় নেতা-কর্মীদের মনোবলে চিড় ধরবে। সরকার যে কোনোভাবেই নরম পথে হাঁটছে না, সেটা বুঝতে পারবে।

অন্যদিকে বিএনপি বলছে সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, তুরাগের ইজতেমা মাঠ ও পূর্বাচলের কথা বলছে। তারা সরকারের চাওয়া স্থানে যেতে চাচ্ছে না। অন্য বিকল্প স্থানে সমাবেশ করবে। বিএনপি নেতারা নয়াপল্টনের কাছেই আরামবাগে সমাবেশ করার কথাও এখন বলছেন। এর মাধ্যমে দলটি মনে করছে সরকার যে জায়গাগুলোর কথা বলছে সেখানে তারা সমাবেশ করবে না। তাদের পছন্দের জায়গায় করবে। এটা একটা ‘উইন-উইন পরিস্থিতি’ তৈরি করবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মনে করেন, সরকার বুঝতে পেরেছে তাদের সময় শেষ হয়ে আসছে। এ কারণে বিএনপির একটা সমাবেশ নিয়েও শঙ্কিত। তিনি বলেন, ‘বিএনপি অনেক সমাবেশ নয়াপল্টনে করেছে। কখনো কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। জনসমর্থ না থাকায় সরকার এমন অজুহাত দিচ্ছে।’

অবশ্য দুই দলের নেতারাই বলছেন, সমাবেশের আগে কথার উত্তেজনা চললেও এটা সংঘাতে রূপ নেবে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক দৈনিক বাংলাকে বলেন, সড়কে কোনো সমাবেশ করার অনুমতি তারা দিতে পারেন না। সমাবেশ মাঠে হতে হবে।

যদিও বিএনপি নেতারা ঢাকায় একটা বিকল্প জায়গা খুঁজছেন। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন। বিএনপি আরামবাগ সড়কে সমাবেশ করার জন্য স্থান পেয়েছে বলে দলটির দপ্তরের একজন নেতা জানিয়েছেন। পুলিশকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।